জরুরী বিজ্ঞপ্তি
সরকারী মিডিয়া তালিকাভুক্ত জাতীয় দৈনিক বাংলার সময় পত্রিকা  Reg: No: DA 6077
শিরোনাম
‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’ কবিরহাটে সাংবাদিককে মারধরের প্রতিবাদে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলনে ব্যক্তিগত বিষয় তোলার নিন্দা আওয়ামী লীগ করেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, এখন আরেক দল জুলাই নিয়ে ব্যবসা করছে: ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ পুলিশের তৎপরতায় লোহাগাড়ায় অপহৃত শিক্ষক উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২ শরীয়তপুরের সাবেক এমপি বিএম মোজাম্মেল হককে আরও এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখালেন আদালত নাটোরে তিন ফসলি জমির মাটি কাটার অপরাধে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা, ব্যাটারি জব্দ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুমোদনহীন টাইলস পুটিং ও ক্লিনার কারখানাকে এক লাখ টাকা জরিমানা লোহাগাড়ায় জাতীয় যুব দিবস উদযাপন: আলোচনা সভা ও যুব ঋণ বিতর সীতাকুণ্ড প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালু উত্তোলন, ১৭ মাস না যেতে ৩ জন খুন সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১২জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে  দিয়েছে বিজিবি

‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’

  • Update Time : Tuesday, November 3, 2026

ছোটবেলায় ছাত্রজীবন রচনা লেখার সময় সূচনা হিসেবে লিখেছিলাম, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’—অর্থাৎ, অধ্যয়নই (পড়াশোনা) ছাত্রদের তপস্যা। বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের মোক্ষম সময় ছাত্রজীবন, কারণ এ সময়ে সাধারণত সাংসারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ থাকে না। ফলে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করে এবং দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

কিন্তু এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সব ধারণা পাল্টে দিয়েছে। ২২ বছরের মধ্যে এত বড় অবনতি দেশকে হতবাক করেছে। শুধু তা-ই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে কমেছে। কেউ পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এই চিত্রই দেখা গেছে।

এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী; গত বছর পেয়েছিল ৬৩ হাজার। এর অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় সাড়ে ১০ লাখ; পাস করেছে ৫ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ফেল করেছে! এটি উদ্বেগজনক। এক কথায়, বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় এমন ভয়াবহ ফল বিপর্যয় পুরো বাংলাদেশের জন্য লজ্জার এবং অশনিসংকেত। এর অর্থ কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার? এসব প্রশ্নের উত্তর গভীরভাবে অনুসন্ধান করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি।
অবকাঠামোগত ত্রুটি, পাঠদানের ঘাটতি, শিক্ষকস্বল্পতা ও বৈরী আবহাওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। ২০২৪ সালের আন্দোলনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অন্ধভাবে যোগ দিতে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়েই পড়াশোনায় ভাটা পড়তে শুরু করে। কথায় কথায় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন অপব্যবহার, অপরিণত বয়সে মোবাইল ফোন ব্যবহার, অভিভাবকদের গাফিলতিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার- এসবও অনেকাংশে দায়ী।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে মোবাইল ফোন এখন যত্রতত্র ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। ফলে বাড়ছে মোবাইল-আসক্তি, আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এসবের কুফল এবারের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি। অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহার, কিছু অভিভাবকের প্রশ্রয় এবং সঠিক সময়ে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা না করা-এসব কিশোরসমাজকে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত পথে যেতে উৎসাহিত করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে লেখাপড়ায়, যার সুস্পষ্ট প্রমাণ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। এবারের উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় এর মারাত্মক প্রভাব দেখা যাবে।

আমাদের নিজেদের দুটি চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান- (ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ) পরিচালনার অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি আমার চোখে পড়ছে, তা হলো কিছু কিছু পিতা-মাতার দায়িত্বহীনতা, শৈথিল্য ও সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া তাদের স্বাভাবিক ছাত্রজীবনের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে এবং অন্যান্য শিক্ষাকার্যক্রমে ব্যাপক অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। কলেজ থেকে যোগাযোগ করা হলে বেশির ভাগ পিতা-মাতা বা অভিভাবকের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এমনকি তাঁরা সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষেও অবস্থান নেন। এসব আচরণ পেশাগত পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে এবং উন্নত ভবিষ্যতের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এ ধরনের ঘটনা ভাবনারও অতীত ছিল। অভিভাবকেরা জানতে পারলে তো রক্ষা ছিল না!

আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। গত ১৫ বছর ধরে সেখানে আমার স্বর্গীয় পিতার পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘আশুতোষ চক্রবর্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান করে আসছি। সেখানে স্থানীয় ১০ থেকে ১৫টি সেরা স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর ১০০ জনকে এই বৃত্তি দেওয়া হয়। একজন মন্ত্রী বা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ের এই বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই সঙ্গে প্রকাশিত হয় একটি বর্ণাঢ্য স্মরণিকা, যেখানে বৃত্তিপ্রাপ্ত সব শিক্ষার্থীর ছবি ও ফলাফলের বিবরণ থাকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্মরণিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখেছি—কোনো কোনো স্কুলের প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি, যা উদ্বেগজনক। এই তথ্যেই দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানের চিত্র ফুটে ওঠে। তাই রাষ্ট্রকে এই সংকটময় অধ্যায় গভীরভাবে উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই হবে না। সামাজিক ও পারিবারিক নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে আমি মনে করি। এত দিন আমরা শুধু দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত হয়েছি। কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়ের নানা দিকের পাশাপাশি মানহীন শিক্ষা ও নজরদারির অভাবও স্পষ্ট। এই ক্রান্তিলগ্নে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এর সঙ্গে হতাশাজনিত আত্মহত্যার মতো ঘটনাও যুক্ত হতে পারে, যা কখনোই কাম্য নয়।

সুতরাং, শুধু সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে সুশিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলতে প্রতিটি পরিবার ও অভিভাবককে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কারণ, সবার আগে বাংলাদেশ গড়তে হলে চাই আলোকিত মানুষ, যারা গড়বে আগামী বাংলাদেশ।

ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved ©2000 Banglarshomoy
Design & Develop BY Coder Boss